হংসেস্বরী মন্দিরে এক বিকেলে রুপসা ও অনুপম

আর মাত্র 10 মিনিট আছে,ট্রেন টা পাবো তো? ট্রেন টা মিস হয়ে গেলে আজকে আর যাওয়া হবে না মনে হয়। 4:35 এর আজিমগঞ্জ প্যসেঞ্জার টা না  পেলে সব মাটি হয়ে যাবে। টিকিট ও কাটা হয় নি । ভেতরে ভেতরে একটু টেনশন হচ্ছিল অনুপম এর। ব্যারাকপুর থেকে নৌকায় করে ঘাট পার হয়ে শেওড়াফুলি যাচ্ছিল। সঙ্গে রুপসা । গন্তব্য হংসেস্বরী মন্দির-বাঁশবেড়িয়া। রুপসা আর অনুপম একসাথে পড়ে এম. এস. সি তে। বিষয় পদার্থবিদ্য়া। অনেকদিন পর আজকে প্র্যাকটিকাল ক্লাস হয় নি তাই অনুপম ভাবলো একটু ঘুরেই আসি। অনুপম সুযোগ পেলেই কাছে পিঠে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। রূপসার কাছে এদিক ওদিক যাওয়ার গল্প করে। রুপসা মন দিয়ে শোনে। ঘোরা আর ছবি তোলার খুব সখ অনুপম এর। গত জন্মদিনে বাবার কাছ থেকে অনেক কষ্টে একটা নিকন এর ডি.এস.এল.আর বাগিয়েছে। এমনি তে একা একাই যায়, আজকে রুপসা কে বলে দেখল একবার। একবারে রাজী হয়ে যাবে ভাবতেই পারেনি। আসলে আজকে রূপসার মা বাড়িতে নেই।

তাড়াতাড়ি হাঁট, নাহলে ট্রেন টা পাবো না তো-অনুপম জোরে জোরে হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরে রুপসার দিকে তাকিয়ে বলল। দ্যাখ এর থেকে বেশী জোরে আমি হাঁটতে পারব না-রূপসার উত্তর বাজার এর কোলাহল এর মধ্যে মিশে গেল।একে তো মে মাসের গরম, তার উপর এই হন্তদন্ত হয়ে হাঁটা। দরদর করে ঘামছিল দুজনে। টিকিট কেটে প্ল্যাটফর্ম এ পৌঁছে দেখল ট্রেন তখনো ঢোকে নি। একটা লোক অনেক্ষণ থেকে রূপসার আসে পাশে ঘুরছে। নৌকায়-ও ছিল লোকটা। কি মতলব লোকটার ? ওহ: ব্যাটা রুপসা কে নিয়ে আজন্তে সেলফি তোলার চেষ্টা করছে। “ও: দাদা কি ব্যাপার আপনার”- অনুপম ধমক এর সুরে কটমট করে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল। লোকটা একটু থতমত খেয়ে বুঝতে পেরে ওখান থেকে সটান কাট মারলো। ট্রেন ঢুকছে স্টেশন এ। দুজনে কোনক্রমে উঠলো ট্রেন এ। ট্রেন মোটামুটি ফাঁকা ছিল। রূপসা কে দেখে সরে বসে এক ভদ্রলোক জায়গা করে দিল। অনুপম হাসতে হাসতে কানে কানে রুপসাকে বললো তোর মতো সুন্দরী সাথে থাকলে ওজনটা বেশ বেড়ে যায় বুঝলি? শুনে রুপসা ও হাসতে লাগলো। ব্যান্ডেল স্টেশন ছাড়লো ট্রেন। “এই ওঠ এবার নামতে হবে”।যাক অবশেষে দুজনে নামল বাঁশবেড়িয়া স্টেশন এ। রূপসার এই দিক টায় কোনদিন আসে নি । “এদিকের স্টেশন গুলো খুব  পরিস্কার আর নিরিবিলি তাই না ?”। অনুপম এদিকটা মাঝে এসেছে কয়েকবার তাই উত্তরে বলল -” ঠিক বলেছিস-এদিকের সব  স্টেশন গুলোই এই রকম- পরিস্কার, ছিমছাম।

দর দাম করে ঠিক হলো একবারে মন্দির পর্যন্ত 15 টাকা নেবে টোটো । ঠিক আছে -সন্ধ্যে হয়ে আসছে , তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে  হবে, আলো কমে এলে ছবি আসবে না ভালো। দুজনে যখন পৌছালো মন্দির এ তখন  বাজে সোয়া -পাঁচটা । অনুপম কোথাও যাওয়ার আগে তার ঠিকুজী -কুষ্টি  সব বের করে গুগুল সার্চ করে । মন্দিরে  ঢোকার আগে জুতো  খুলে  রেখে যেতে হয় বাইরে । মন্দির চত্বর টি এখন ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এর  অধীনে। রূপসার খুব ভাল লাগছিল জায়গাটা । পাশাপাশি দুটি মন্দির -একটি হংসেস্বরী এবং অনন্ত বাসুদেব মন্দির । অনন্ত বাসুদেব মন্দির টি তে টেরাকোটার প্রচুর কাজ আছে । হংসেস্বরী মন্দির চত্বর এ মা-কালীর মন্দিরটি সংভবা কালী মন্দির নামে পরিচিত ।  “খুব সুন্দর না মন্দির গুলো “- রুপসা বলল অনুপম কে। অনুপম তখন মহানন্দে ছবি তুলতে ব্যস্ত। সূর্যাস্তের আলোয় অপূর্ব লাগছিল টেরাকোটার তৈরী অনন্ত বাসুদেব মন্দিরটি ।  অনুপম রূপসার দিকে তাকিয়ে বলল – জানিস এই মন্দির এর ইতিহাস ? এই মন্দিরটি তৈরী করা শুরু করেছিলেন রাজা নৃসিংহ দেব রায়, পরবর্তিতে তাঁর স্ত্রী রানী সংকরী সম্পুর্ন রূপে  মন্দির তৈরির কাজ শেষ করেন 1824 সালে । আর কালী মন্দির টি  রাজা নৃসিংহ দেব রায় তৈরী করেছিলেন তারও আগে 1788 সালে। শীতের সময় এই মন্দির চত্বর এ বিশাল মেলা বসে জানিস ? রুপসা উত্তরে বললো -তাই ? দেখতে দেখতে  সন্ধ্যা নেমে এলো রে চল এবার ফিরি ।

হংসেস্বরী মন্দির

স্টেশনে ফিরে দুজনেই অনুভব করলো ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে । স্টেশন এ তেমন লোকজন নেই ।  কয়েকজন বয়স্ক লোক সান্ধ্য আড্ডায় মশগুল ।  একটি দোকানে কেক পাওয়া গেল । স্টেশন এ বসে কেক খেতে খেতে, অনুপম রূপসার দিকে তাকিয়ে বললো জানিস স্টেশন এর এই আলোতে তোকে বেশ দেখাচ্ছে , জানিস একবারে প্রতিমার মতো।  লজ্জায় মুখটা একটু নামিয়ে রুপসা শুধু উত্তর দিল  ” ধ্যাত”।  সত্যি বলছি – একটা ছবি তুলব  তোর ।  এতগুলো তো তুললি ।  আরে ওগুলো তো মন্দিরের ওখানে ।  আচ্ছা ঠিক  আছে তোল ।  ছবি তুলে  রুপসাকে  দেখিয়ে বলল – কেমন হয়েছে দেখ ।  বাহ ভালো এসেছে তো ছবিটা ।  তুই কিন্তু ভালো ছবি তুলিস । দূর থেকে ট্রেন এর বাঁশী সোনা যাচ্ছে  ট্রেন ঢুকছে স্টেশন এ  – নৈহাটি হয়ে যাবে।   দুজনে উঠালো ট্রেনে ।

অনন্ত বাসুদেব মন্দির

ফাঁকা ছিল ট্রেন ।  পাশাপশি বসলো দুজনে। অন্যমনস্ক  হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে রুপসা ভাবতে লাগলো ছোটবেলার কথা ।  বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়া , সিনেমা দেখতে যাওয়া । শেষবার গেছিল  নিকো পার্ক ।  খুব  মজা হয়েছিল । রূপসার বাবা আর এখন ওদের সাথে থাকে না। এই  কি এত  ভাবছিস বলত ? ।  না না কিছু না ।  আরে আমাকে বলতে পারিস -আমি তোর  ভালো বন্ধু । রুপসা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল – মাঝে মাঝে  নিয়ে যাবি  আমকে তোর সাথে এভাবে ।  অনুপম বলল -“সত্যি যাবি তুই আমার সাথে ? তোর মা কিছু বলবে না ? রুপসা উত্তর দিল -ও আমি ঠিক ম্যানেজ  করে নেবো।  এই স্টেশন এসে গেছে  নামতে হবে ।  চল আমি তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি ।  যেই ভাবা অমনি কাজ  ট্রেন থেকে  রূপসার পেছন পেছন নেমে পড়ল   অনুপম ।   রূপসার মন ভালোলাগায় ভারে গেলেও  ধমক এর সুরে  অনুপম কে বলল -তুই কেন নামতে গেলি বল ।  এমনিই ইচ্ছে হলো ।  নেমেই যখন পড়েছিস চল পৌঁছে দিয়ে আসবি। রূপসার বাড়ি  স্টেশন থেকে মিনিট  দশেক এর হাঁটা পথ। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো । কেমন একটা ভালোগাগায় ভরে গেছে দুজনের মন।  আগে রুপসা এভাবে  বেরোয় নি ।  বান্ধবীদের সাথে  ঘুরতে গেছে এদিক ওদিক ।  অনুপম কে কেমন আপন আপন লাগছে । এতদিন একসাথে পড়ছে  কিন্তু এরকম অনুভূতি হয়নি আগে । তাহলে কি সে অনুপম কে পছন্দ করে ।  বাড়ির কাছাকাছি আসতেই  অনুপম বলল চলি রে । রুপসা সাথে সাথে বলল  চলি রে মানে ? আগে আমার বাড়ি যাবি , তার পর একটু বসে চা খেয়ে যাবি ।  অনুপম  উত্তর দিল -না রে আজ থাক ।  টা টা- কাল কলেজ এ দেখা হবে ।  উল্টো দিকে হাঁট শুরু করলো অনুপম ।  যেতে যেতে ভাবতে লাগলো রুপসা কি তাকে পছন্দ করে ? দূর- না না  কি ভুলভাল ভাবছি, ও তো শুধু আমার সাথে ঘুরতে যেতে চেয়েছে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s